বন্ধুর বোনের গল্পটা অন্যরকম
আকাশ আর রিমি। দুজনের পরিচয়টা এমনই ছিল যে, কেউ ভাবেনি কোনোদিন এটা এভাবে বদলে যাবে।
আকাশ আর রাহাত ছোটোবেলা থেকে অভিন্নহৃদয়। দুজনের বাড়ি পাশাপাশি, স্কুল এক, কলেজ এক, এমনকি একই কোম্পানিতেও চাকরি। রাহাতের ছোটোবোন রিমি, আকাশের কাছে সবসময় “ছোট্ট রিমি”। যে মেয়েটা একসময় আকাশের পিছু পিছু ঘুরে “ভাইয়া” “ভাইয়া” করে কাঁদতো, যখন আকাশ-রাহাত মিলে তাকে টিজ করতো।
বছরগুলো গড়ালো। রিমি এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইনাল ইয়ারে। চুল ছোটো করে ফেলেছে, চোখে কাজল, গলায় স্কার্ফ জড়িয়ে যখন বেরোয়, পাড়ার লোকেও আর চিনতে পারে না। আকাশ কিন্তু চিনতে ভুল করেনি। বরং চিনতে গিয়েই যেন হঠাৎ চমকে উঠলো একদিন।
ঘটনাটা এরকম।
এক বর্ষায় বিকেল। রাহাত অফিস থেকে ফিরতে দেরি করবে বলে ফোন করেছিল। আকাশ ততক্ষণে রাহাতের বাড়িতে বসে আছে। রিমি দরজা খুলে দিল। ভেজা চুল, হাতে কফির মগ।
“ভাইয়া এসো। দাদা আসতে রাত হবে। তুমি বোসো, আমি কফি দিচ্ছি।”
আকাশ বসলো। রিমি কফি দিয়ে গেল। তারপর নিজেও বসলো সামনে। বৃষ্টি পড়ছে জোরে। জানালার কাচে শব্দ হচ্ছে। হঠাৎ রিমি বলল,
“ভাইয়া, তোমার মনে আছে? তুমি আর দাদা আমাকে বলেছিলে, বড় হয়ে কাউকে ভালোবাসলে সে নাকি আমাকে নিয়ে পালাবে?”
আকাশ হেসে ফেললো, “আরে হ্যাঁ, তুই তো কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কাছে গিয়েছিলি।”
রিমি চোখ নামিয়ে হাসলো, “তোমরা খুব দুষ্টু ছিলে।”
তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, “কিন্তু এখন আর কেউ নিয়ে পালাতে চায় না।”
আকাশের বুকের ভিতরটা কেমন যেন চাপলো। সে হাসার চেষ্টা করে বলল, “কেন? তোর বয়ফ্রেন্ড নেই?”
রিমি মাথা নেড়ে বলল, “নেই। আর থাকলেও… যাকে চাই, সে তো আমাকে এখনো ‘ছোটো বোন’ ভাবে।”
আকাশের হাতের কফির কাপটা থেমে গেল ঠোঁটের কাছে। সে তাকালো রিমির দিকে। রিমি চোখ তুলে তাকালো একবার, তারপর আবার নামিয়ে নিল।
সেদিন আর কথা বাড়েনি। কিন্তু তারপর থেকে আকাশের মনে একটা অস্বস্তি শুরু হলো। রাতে ঘুম আসে না। রিমির হাসি, চোখ নামানোর ভঙ্গি, গলার স্বর, সব যেন তার মাথার ভিতর ঘুরতে লাগলো।
কয়েক মাস কেটে গেল। রাহাত কিছুই বুঝতে পারছে না। কিন্তু আকাশ আর রিমির মধ্যে চোখে চোখে কথা হতে শুরু করেছে। মেসেজ। রাতে ফোন। “ভাইয়া” ডাকটা আর নেই। শুধু “আকাশ”।
একদিন রাতে রিমি মেসেজ করলো:
“তুমি যদি আমাকে এখনো ছোটো ভাবো, তাহলে আর কখনো মেসেজ করবো না।”
আকাশ অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলো। তারপর লিখলো,
“আমি তোকে আর ছোটো ভাবি না রিমি। আমি ভয় পাই। রাহাত কী ভাববে?”
রিমি রিপ্লাই করলো:
“দাদাকে আমি বুঝিয়ে দেব। তুমি শুধু বলো, তুমি আমাকে ভালোবাসো কি না।”
আকাশের হাত কাঁপছিল। সে লিখলো,
“ভালোবাসি। অনেক দেরিতে বুঝেছি, কিন্তু ভালোবাসি।”
তারপরের দিনগুলো স্বপ্নের মতো। চোরা চোখে দেখা, হাতে হাত রাখা, বৃষ্টিতে একসাথে ভিজে যাওয়া। রাহাত কিছুদিন পর টের পেল। প্রথমে রাগ করলো। তারপর অনেক রাত জেগে দুই বন্ধুতে কথা হলো। রাহাত শেষে বলল,
“তুই যদি ওকে সুখী রাখতে পারিস, তাহলে আমি রাজি। কিন্তু একটা আঁচড়ও লাগলে… সমঝে নিস।”
আকাশ হেসে রাহাতকে জড়িয়ে ধরলো।
আর রিমি? সে এখনো লজ্জা পায় যখন আকাশের সামনে আসে। কিন্তু চোখে চোখে হাসে। আর বলে,
“দেখো, শেষমেশ তোমাকেই নিয়ে পালাতে হলো।”
আকাশ হেসে বলে, “তোকে নিয়ে পালাতে আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
বিয়ের দিনটা এলো প্রায় দুই বছর পর।
রাহাত নিজের হাতে বন্ধুর গলায় মালা পরিয়ে দিল। চোখটা একটু চিকচিক করছিল, কিন্তু মুখে হাসি। সে ফিসফিস করে বলল, “আজ থেকে ও আমার বোন না, তোর বউ। মনে থাকবে তো?”
আকাশ শুধু মাথা নেড়েছিল। কথা বলার ক্ষমতা ছিল না। রিমি লাল বেনারসিতে যেন আগুনের শিখা। চোখে তার সেই লজ্জা মিশ্রিত হাসি, যেটা আকাশ প্রথম দেখেছিল বর্ষার সেই বিকেলে।
বিয়ের পর প্রথম রাত। দুজনে একটু অপ্রস্তুত। বছরের পর বছর “ভাইয়া” ডাক শুনে এসেছে রিমি, হঠাৎ “আকাশ” বলতে গিয়েও থেমে যায়। আকাশ বুঝতে পারে। সে হাত বাড়িয়ে রিমির হাত নিল।
“আজ থেকে নতুন করে শুরু, ঠিক আছে?”
রিমি মাথা নামিয়ে হাসল, “ঠিক আছে… কিন্তু একটা শর্ত।”
“কী?”
“তোমাকে আমি এখনো টিজ করতে পারব। বন্ধুর বোনের অধিকার থাকবে জীবনভোর।”
আকাশ হেসে তাকে কাছে টেনে নিল। “থাকবে। তুই যা খুশি কর। আমি শুধু তোকে দেখব।”
তারপরের বছরগুলো যেন উড়ে গেল।
আকাশের চাকরি বদলি হলো চট্টগ্রামে। রিমি কোনো আপত্তি করল না। সে বলল, “তোমার সঙ্গে থাকলে যেকোনো শহর আমার বাড়ি।” দুজনে নতুন ফ্ল্যাটে উঠল। ছোট্ট বারান্দায় দুটো চেয়ার, সামনে সমুদ্র। প্রতি সন্ধ্যায় দুজনে বসে চা খায় আর পুরোনো গল্প করে।
একদিন রিমি হঠাৎ বলল, “আচ্ছা, আমার যদি দাদার মতো স্বভাবের ছেলে হয়, তুমি কী করবে?”
আকাশ ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “মানে?”
রিমি লজ্জায় লাল হয়ে গেল, “মানে… আমি মা হব।”
আকাশের হাত থেকে চায়ের কাপ পড়ে গেল। সে কিছুক্ষণ চুপ করে রিমিকে দেখল, তারপর এক লাফে তাকে জড়িয়ে ধরল। “তুই আমাকে বাবা বানাবি?”
রিমি হেসে কাঁদছিল, “হ্যাঁ। আর তুমি যদি এখনো আমাকে ছোটো মনে করো, তাহলে আমি একাই বড় করব।”
আকাশ তার কপালে চুমু খেল, “তোর কাছে আমিই তো সারাজীবন ছোটো থেকে যাব।”
নয় মাস পর একটা মেয়ে এলো। চোখ দুটো ঠিক রিমির মতো। নাকটা আকাশের মতো। নাম রাখা হলো “রাই”। রাহাত এসে কোলে নিয়ে বলল, “এই দেখ, আমার বোনের মেয়ে আমার মতো দেখতে হবে না তো কার মতো হবে?”
বছর ঘুরতে লাগল। রাই বড় হতে লাগল। আর আকাশ-রিমির ভালোবাসা যেন প্রতিদিন নতুন হয়ে জন্ম নেয়।
একদিন রাতে রাই ঘুমিয়ে গেছে। বারান্দায় দুজনে বসে। সমুদ্রের শব্দ। রিমি হঠাৎ বলল,
“জানো, আমি কখনো ভাবিনি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্পটা আমার বন্ধুর বোন হয়ে শুরু হবে।”
আকাশ তার হাত শক্ত করে ধরল।
“আর আমি কখনো ভাবিনি, আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুর ছোটোবোনই একদিন আমার পুরো পৃথিবী হয়ে যাবে।”
তারপর দুজনে চুপ করে রইল। শুধু হাতে হাত রেখে। সমুদ্রের ঢেউ আর বাতাস তাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াতে লাগল। যেন বলতে চাইল, কিছু ভালোবাসার গল্প কখনো শেষ হয় না… শুধু নতুন করে শুরু হয়, আবার আবার।
বয়স বাড়তে লাগল। চুলে পাক ধরল। রাই এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। তারও একজন “বন্ধুর বন্ধু” আছে, যাকে সে লুকিয়ে লুকিয়ে মেসেজ করে। রিমি হাসে, আকাশকে বলে,
“দেখো, ইতিহাস নিজেই নিজেকে রিপিট করছে।”
আকাশ শুধু মাথা নেড়ে হাসে। আর মনে মনে ভাবে, ঈশ্বর যেন ওদের গল্পটাও আমাদের মতো সুন্দর করে দেন।
একটা শীতের সকাল। চট্টগ্রামের ফ্ল্যাটটা এখনো একই। বারান্দার দুটো চেয়ার এখনো আছে। আকাশ আর রিমি দুজনেই সাদা চুল। হাতে হাত রেখে বসে। সমুদ্রটা এখনো একই রকম ঢেউ তোলে।
রিমি আস্তে করে বলল,
“আকাশ, মনে আছে সেই বর্ষার বিকেলটা? যেদিন তুমি প্রথম বুঝেছিলে আমি আর ছোটো নই?”
আকাশ হাসল। চোখে জল চিকচিক করছে।
“মনে থাকবে না? সেদিন থেকে আমার জীবনটা যে শুরু হয়েছিল আসলে। তার আগে শুধু বেঁচে ছিলাম।”
রিমি তার কাঁধে মাথা রাখল।
“আমারও। তুমি আমাকে ‘ছোটো বোন’ বলে ডাকতে, আর আমি রাগ করতাম। কিন্তু ভেতরে ভেতরে খুব ভয় পেতাম যদি সত্যি সত্যি তুমি আমাকে কখনো বোনই ভেবে ফেলো।”
আকাশ তার হাতটা আরো শক্ত করে ধরল।
“ভেবেছিলাম। কিন্তু তুই আমাকে ভুল প্রমাণ করলি। প্রতিদিন, প্রতিটি মুহূর্তে।”
দুজনে চুপ করে রইল অনেকক্ষণ। শুধু সমুদ্র আর হাওয়ার শব্দ।
তারপর রিমি খুব আস্তে, প্রায় ফিসফিস করে বলল,
“যদি আবার জন্মাই, আবার তোমার বন্ধুর বোন হয়ে জন্মাব। আবার তোমাকে বিরক্ত করব। আবার তুমি আমাকে ‘ছোটো’ বলবে। আর আমি আবার তোমার সঙ্গে পালাব।”
আকাশ হেসে তার কপালে ঠোঁট রাখল।
“আর আমি আবার দেরি করে বুঝব যে আমি তোকে ভালোবাসি। কিন্তু শেষমেশ তোকে নিয়েই পালাব। বারবার। জন্মের পর জন্ম।”
সেদিন সন্ধ্যায় রাই ফোন করল।
“মা, বাবা, আমি একটা কথা বলতে চাই।”
রিমি আর আকাশ চোখে চোখে তাকাল। দুজনের মুখেই একই হাসি।
রিমি ফোনটা কানে নিয়ে হেসে বলল,
“বল Betty, আমরা শুনছি।”
সমুদ্রের ঢেউ তখন যেন আরো জোরে হাসছিল।
কারণ কিছু গল্প কখনো শেষ হয় না।
শুধু পরের প্রজন্মের কাছে হাত বদল হয়।
আর ভালোবাসা থেকে যায়—
চিরকালের জন্য।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন